হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরছে জ্বালানি বাজারে, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

এটি শুধু দুটি দেশের বিষয় নয়; এর প্রভাব অনেক বৃহৎ। আগামীকাল ১৯ জুন শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে আনুষ্ঠানিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে, যা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ৭০ দিন আগে হওয়া যুদ্ধবিরতিকে আরও সুদৃঢ় করার কথা। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়বে। নিচে বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার অবসান এবং হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের অপেক্ষায় ছিল। যুদ্ধ চলাকালে এসব দেশ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে, প্রণালী অবরোধের কারণে তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে এবং হতাহতও হয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই সমঝোতা আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (GCC) সদস্য দেশগুলো এই সংঘাতের অন্যতম বড় ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক মডেলের প্রতি আস্থা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। বিদেশি কর্মী ও পর্যটকের সংখ্যাও কমেছে। কিছু ক্ষেত্রে, যেমন কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) স্থাপনায়, গুরুতর অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, যা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে বহু বছর লাগতে পারে।
এই যুদ্ধ নিয়ে GCC দেশগুলোর অবস্থান এক ছিল না। ওমান ও কাতার শুরু থেকেই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, আর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলকভাবে দ্ব্যর্থক অবস্থান নিয়েছিল। তবে এখন, প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রাক্কালে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, উপসাগরীয় দেশগুলো অবিলম্বে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনা কম। ওয়াশিংটনের ওপর মিত্র হিসেবে আস্থা কিছুটা কমে গেছে। যদিও নিরাপত্তার জন্য তারা এখনও মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের আহ্বান থাকলেও GCC দেশগুলো এটিকে অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে হয় না। বরং তারা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চায়, যা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপের সমাধান করবে।
ইরানের সাম্প্রতিক শক্ত প্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতার পর উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে উঠবে না। তবে ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে তারা কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে।
জেরুজালেমে অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ইসরায়েল পরাজিত হয়েছে। মাত্র ১৮ শতাংশ ইসরায়েলি এই চুক্তিকে সমর্থন করছে।
ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছিলেন এবং ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানের ইসলামপন্থী শাসকদের সঙ্গে সমঝোতার ধারণা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছেন। চুক্তির উদীয়মান কাঠামো ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলোকে সত্যি বলে মনে করাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া ছাড়া তেহরান যেন তেমন কোনো দৃশ্যমান ছাড় দেয়নি, অথচ যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধান উদ্বেগ হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে শুধু প্রতিশ্রুতি রয়েছে, বাস্তব প্রয়োগের রূপরেখা নেই। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব হুমকি মোকাবিলার দায় ইসরায়েলের ওপরই রয়ে যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি। ট্রাম্প নাকি চুক্তির খসড়া নেতানিয়াহুকে দেখাননি এবং প্রকাশ্যে তার বিচারবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানি আলোচকদের “খুবই যুক্তিবাদী” বলে প্রশংসা করেছেন।
ট্রাম্পের কথিত সতর্কবার্তা—“সাবধান থাকুন, নইলে খুব শিগগিরই আপনাদের একাই চলতে হবে”—ইঙ্গিত দেয় যে দুই মিত্রের সম্পর্কে আরও টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে।
লেবাননে এই চুক্তিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ হবে, কিন্তু লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরান মনে করে চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, তাদের সেনারা অবস্থান বজায় রাখবে।
হিজবুল্লাহ সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ করলেও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে গোলাবর্ষণ ও ড্রোন তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহ আগের চেয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী এবং ইরানের আরও ঘনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নতুন উপস্থিতি তাদের “প্রতিরোধ” বর্ণনাকে নতুন শক্তি দিয়েছে, ফলে তারা অস্ত্র সমর্পণে আরও অনড় হয়ে উঠেছে। লেবানন সরকারের জন্য হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এখন আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ইরাক এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের একটি। দেশটি অর্থনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় না খুললে জুলাই মাসে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ত।
প্রণালী খুলে যাওয়ায় ইরাক আবার তেল রপ্তানি করতে পারবে, যা তাদের সরকারি আয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের প্রভাব কমেনি। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা যুদ্ধের সময় তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করেছে এবং ইরাকে তেহরানের প্রভাব এখনও বহাল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত থেকে সিরিয়া তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরং সিরিয়া ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর বিকল্প জ্বালানি রুট হিসেবে গুরুত্ব পেতে পারে। ইরাক ইতোমধ্যেই সিরিয়ার মাধ্যমে তেল পরিবহন শুরু করেছে। ভবিষ্যতে নতুন পাইপলাইন প্রকল্পও গড়ে উঠতে পারে।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি না হলে সিরিয়া এখনও ঝুঁকির মধ্যে থাকবে, কারণ ইসরায়েল তার নিরাপত্তার স্বার্থে সিরিয়ার ভেতরে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারে।
এই চুক্তির অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হতে পারে পাকিস্তান। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, বিশাল শিয়া জনসংখ্যা, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে লাখো পাকিস্তানি কর্মীর উপস্থিতির কারণে পাকিস্তান সংঘাতের প্রভাবের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল।
চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার ফলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মর্যাদা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের ভাবমূর্তি উন্নত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে সমালোচকদের মতে, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে উৎসাহিত করতে পারে।
মার্কিন-ইরান চুক্তি রাশিয়ার জন্য একদিকে লাভজনক, অন্যদিকে ক্ষতিকর। ইরান যখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত করছিল, তখন তেলের দাম বেড়ে রাশিয়া লাভবান হচ্ছিল। কিন্তু চুক্তির ঘোষণার পর থেকেই তেলের দাম কমতে শুরু করেছে, ফলে রাশিয়ার আয় কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় সংঘাতের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে গিয়েছিল। চুক্তি কার্যকর হলে সেই সুবিধাও রাশিয়া হারাতে পারে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় চীন এই সংকটের প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত ছিল। চীনের জ্বালানি ব্যবস্থায় কয়লার ভূমিকা এখনও বড়, এবং তাদের বিশাল তেল মজুত রয়েছে। ফলে তারা তাত্ক্ষণিক জ্বালানি সংকটে পড়েনি।
চীনের প্রধান উদ্বেগ ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশ তেলের ওপর নির্ভরশীল, আর সেই দেশগুলোই চীনা পণ্যের প্রধান ক্রেতা।
চীনের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে গেলে তারা কম দামে তেল ও গ্যাস আমদানি করতে পারবে। এছাড়া চুক্তির ফলে ইরান যদি ভবিষ্যতে নৌ চলাচলের ওপর নতুন ফি আরোপ করে, তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় আরও সুবিধাজনক শর্ত পেতে পারে বলে আশা করে।
বেইজিংয়ের মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। বিপুল অর্থ ও সামরিক সম্পদ ব্যয় করার পরও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে।
ফলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে চীন।
Author